এর ফলে প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে; রফতানি ও আমদানি কমতে পারে যথাক্রমে ২ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৫ শতাংশ। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে সানেম জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব গবেষণায় মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি প্রধান ট্রান্সমিশন চ্যানেল চিহ্নিত করেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এ তিনটি চ্যানেল হলো জ্বালানি, রেমিট্যান্স, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা। জ্বালানি চ্যানেলটি নির্দেশ করে যে যেহেতু বাংলাদেশ আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাই জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামের অস্থিতিশীল ও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেশের আমদানি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। একই সঙ্গে এটি চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে তা বোঝার জন্য সানেম ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’-এর কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম (সিজিই) মডেল ব্যবহার করে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি সিমুলেট করেছে।
সানেম বলছে, এ মডেল অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে এর প্রভাবে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রফতানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্রভাবে বাড়বে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধিতে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ, পরিবহন খাতে প্রায় ৩ শতাংশ এবং কৃষি উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন খাতগুলোর ২ দশমিক ৫ শতাংশ পতন হতে পারে।
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে সানেম। এতে বলা হয়, একদিকে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিংয়ের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে সরকারি বার্তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সুস্পষ্ট অমিল রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাতটি সুপারিশ করেছে সানেম।
প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সুপারিশে বলা হয়েছে, জমি এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সবচেয়ে সহজলভ্য ও কার্যকর বিকল্পের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। নেট-মিটারিং ছাড়পত্র দ্রুততর করে এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোগে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের রুফটপ সোলার (ছাদে সৌরবিদ্যুৎ) প্রকল্প ত্বরান্বিত করতে হবে। দ্বিতীয় সুপারিশে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো এবং এর সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন জাতীয় বাজেটে উল্লেখযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার মাধ্যমে সরকার দেশকে আমদানি করা অস্থিতিশীল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনতে পারে।
করমুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম এবং সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণের মতো আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকিকে নবায়নযোগ্য খাতে স্থানান্তরের মাধ্যমে নতুন সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বাধাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে তৃতীয় সুপারিশে।
স্থায়ী জ্বালানি সক্ষমতা অর্জন বিষয়ক চতুর্থ সুপারিশে বলা হয়েছে, স্থায়ী জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন হলেও বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে আমদানিভিত্তিক জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্যায়ণ প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজি পেতে বহুজাতিক চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে।
পঞ্চম সুপারিশে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং এলএনজির জন্য একটি ‘কৌশলগত জাতীয় মজুদ’ গড়ে তোলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ষষ্ঠ সুপারিশে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি রেশনিং (কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ফুয়েল পাস) বাস্তবায়ন করা, শিল্প খাতের উৎপাদন শিফটগুলোকে অফ-পিক আওয়ারে স্থানান্তর করা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সময়সীমা কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংরক্ষিত সীমিত জ্বালানি কৃষি ও রফতানিমুখী উৎপাদন খাতের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সর্বশেষ সুপারিশে নির্ভরযোগ্য বেইসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং দেশের ভেতরে স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার সুপারিশ করেছে সানেম।